ঝাড়গ্রামের ১০টি অদেখা ও শান্ত অফবিট স্পট: রুট ম্যাপ ও খরচের তালিকা

 ঝাড়গ্রামের ১০টি অদেখা ও শান্ত অফবিট স্পট

জঙ্গলমহলের হৃদয়ে, লাল মাটির পথ আর শাল-পিয়ালের সবুজে ঘেরা এক শান্ত পৃথিবীর নাম ঝাড়গ্রাম। ঝাড়গ্রাম মানেই শুধু রাজবাড়ি, চিলকিগড় বা জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র নয়। শহর ও ভিড়ের পরিচিত পথ ছেড়ে একটু ভিতরের দিকে এগিয়ে গেলেই দেখা মেলে এমন কিছু নির্জন বনপথ, ছোট নদী, গ্রাম, জলধারা আর আদিবাসী জনপদের, যেগুলো এখনও অনেক পর্যটকের কাছেই অচেনা। শাল, পিয়াল, মহুয়া ও কাজুবাগানের মাঝ দিয়ে লাল মাটির রাস্তা ধরে এগিয়ে যেতে যেতে মনে হবে, শহুরে জীবনের কোলাহল যেন ধীরে ধীরে অনেক দূরে সরে যাচ্ছে। যারা ভিড় এড়িয়ে প্রকৃতির একেবারে কাছাকাছি কয়েকটা দিন কাটাতে চান, তাঁদের জন্য ঝাড়গ্রামের এই অদেখা ও শান্ত জায়গাগুলো হতে পারে একেবারে অন্যরকম এক অফবিট যাত্রা।

ঝাড়গ্রামের ১০টি অদেখা ও শান্ত অফবিট স্পট


ঝাড়গ্রামের ১০ টি অফবিট স্পটগুলোর পরিচয় -

ঝাড়গ্রামের ভিড় এড়িয়ে প্রকৃতির আরও কাছাকাছি যেতে চাইলে এই ১০টি সুন্দর ও শান্ত অফবিট জায়গা আপনার ভ্রমণের তালিকায় রাখতেই পারেন। কোথায় কীভাবে যাবেন, ঝাড়গ্রাম শহর থেকে কোন জায়গাটি কতটা দূরে, সেখানে কী দেখার বা করার আছে এবং কেন সেই জায়গাটি আপনার ঘুরে দেখা উচিত—সবকিছুই আমরা একে একে তুলে ধরছি। জঙ্গল, নদী, জলধারা, লাল মাটির পথ থেকে শুরু করে আদিবাসী সংস্কৃতি ও নির্জন গ্রাম—এই ১০টি জায়গা আপনাকে ঝাড়গ্রামের একেবারে অন্য একটি রূপের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেবে।

  1. খাঁন্দারানি জলাধার (Khandarani Dam):

    • কেন বিখ্যাত: পাহাড় ও শালবন ঘেরা বিশাল জলাধার। শীতকালে এখানে প্রচুর পরিযায়ী পাখি আসে।শান্ত বিকেলের সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার জন্য অসাধারণ জায়গা।

    • দূরত্ব: ঝাড়গ্রাম শহর থেকে প্রায় ৪৫ কিমি (বেলপাহাড়ির কাছে)।

      ঝাড়গ্রামের ১০ টি অফবিট স্পটগুলোর পরিচয় -
      খাঁন্দারানি জলাধার (Khandarani Dam)

  2. কাকড়াঝোড় (Kakrajhor Forest):

    • কেন বিখ্যাত: ঘন গভীর শাল, সেগুন ও মহুয়া বনের মাঝে ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম। ট্রেকিং ও হাইকিংপ্রেমীদের জন্য স্বর্গরাজ্য।

    • দূরত্ব: ঝাড়গ্রাম শহর থেকে প্রায় ৫৫ কিমি।

      ঝাড়গ্রামের ১০টি অদেখা ও শান্ত অফবিট স্পট


  3. ঘাগড়া জলপ্রপাত (Ghagra Waterfalls):

    • কেন বিখ্যাত: পাথুরে খাদের মধ্য দিয়ে গর্জন করে বয়ে চলা তারাফেনী নদীর এক পাহাড়ি জলপ্রপাত। 'রিলস' বা ফটোগ্রাফির জন্য দারুণ স্পট।

    • দূরত্ব: বেলপাহাড়ি থেকে মাত্র ৭ কিমি (ঝাড়গ্রাম থেকে প্রায় ৪৩ কিমি)।

      ঝাড়গ্রামের ১০টি অদেখা ও শান্ত অফবিট স্পট

  4. তারাফেনী ব্যারেজ ও ড্যাম (Tarafeny Barrage):

    • কেন বিখ্যাত: নদীর ওপর নির্মিত এই ব্যারেজের চারপাশে পাথুরে পথ এবং পাহাড়ের দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। মন শান্ত করার মতো একটি পরিবেশ।

    • দূরত্ব: বেলপাহাড়ি থেকে প্রায় ৫ কিমি।

      ঝাড়গ্রামের ১০টি অদেখা ও শান্ত অফবিট স্পট

  5. ঝিল্লি পাখি বিতান ও জলাধার (Jhilli Pakhiralaya):

    • কেন বিখ্যাত: নৌকাবিহার এবং সাইবেরিয়ান পরিযায়ী পাখি দেখার জন্য একটি অনন্য জলাশয়।

    • দূরত্ব: ঝাড়গ্রাম থেকে প্রায় ১০-১২ কিমি (জম্বনী ব্লকে)।

  6. কেতকী ঝরনা ও লালজল গুহা (Laljal Cave & Ketaki Falls):

    • কেন বিখ্যাত: লালজল গুহা একটি ঐতিহাসিক ও প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। কাছেই রয়েছে গভীর বনের মাঝে প্রাকৃতিক ঝরনা।

    • দূরত্ব: বেলপাহাড়ি থেকে প্রায় ১৮ কিমি।

  7. রমেশশ্বরনগর ও সুবর্ণরেখা নদীঘাট (Rameshwar temple & Subarnarekha River Bed):

    • কেন বিখ্যাত: সুবর্ণরেখা নদীর তীরে অবস্থিত প্রাচীন রামেশ্বর শিব মন্দির। নদীর বালুচর ও আশপাশের শালবনের নীরবতা সত্যি অতুলনীয়।

    • দূরত্ব: ঝাড়গ্রাম থেকে প্রায় ৬০ কিমি (গোবিন্দপুরের কাছে)।

  8. ডুমুরকোটা ক্যানিয়ন ও জঙ্গল (Dumurkota Canyon):

    • কেন বিখ্যাত: অনেকটা পশ্চিমবঙ্গের 'গ্র্যান্ড ক্যানিয়ন' গ্যাংগানির মতো ছোট লাল মাটির খাদের গঠন। খুব কম পর্যটক এখানে যান।

    • দূরত্ব: ঝাড়গ্রাম থেকে প্রায় ২০ কিমি।

  9. হাতীবাড়ি অরণ্য ও ইকো পার্ক (Hatibari Eco Forest):

    • কেন বিখ্যাত: সুবর্ণরেখা নদী ও পশ্চিমবঙ্গ-উড়িষ্যা সীমানার কাছে অবস্থিত সুবিশাল অরণ্য। এখানে বন দপ্তরের ইকো কটেজ রয়েছে।

    • দূরত্ব: ঝাড়গ্রাম শহর থেকে প্রায় ৬২ কিমি।

  10. কণকদুর্গা মন্দির ও ডালকাট জঙ্গল (Chilkigarh Kanak Durga Temple):

    • কেন বিখ্যাত: চিলকিগড় রাজবাড়ির কাছে ডুলুং নদীর তীরে ও ঔষধি গাছের ঘন বনের মাঝে অবস্থিত ৫০০ বছরের পুরনো ঐতিহ্যবাহী মন্দির।

    • দূরত্ব: ঝাড়গ্রাম থেকে প্রায় ১৫ কিমি।


কলকাতা থেকে ঝাড়গ্রাম যাওয়ার রুট ম্যাপ (How to Reach / Route Map)

পাঠকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা: এই পোস্টে দেওয়া ট্রেন ও বাসের সময়সূচি, ভাড়া এবং রুটের তথ্য আমরা যখন ভ্রমণ করেছিলাম, সেই সময়ের তথ্যের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। তাই পরবর্তীতে ট্রেনের সময়, ভাড়া, বাসের পরিষেবা বা রুটে পরিবর্তন হতে পারে। একই ট্রেন বা বাস সব দিন একই সময়ে এবং একই ভাড়ায় পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাই টিকিট কাটার আগে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট রেলওয়ে স্টেশন/রেলওয়ের অফিসিয়াল তথ্যসূত্র অথবা বাসের টিকিট কাউন্টার ও সংশ্লিষ্ট পরিবহন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সর্বশেষ তথ্য যাচাই করে নেবেন। এই তথ্য যাচাই করে তারপরই আপনার যাত্রার পরিকল্পনা করুন। 


(ক) ট্রেনে যাতায়াত (Train Route):

  • নিকটবর্তী রেলওয়ে স্টেশন: ঝাড়গ্রাম (JGM)।

  • কলকাতা থেকে সেরা ট্রেন:

    • ইস্পাত এক্সপ্রেস (12871): হাওড়া থেকে সকাল ৬:৩৫ এ ছাড়ে, ঝাড়গ্রাম পৌঁছায় সকাল ৯:০৮ এ।

    • জনশতাব্দী এক্সপ্রেস (12021): হাওড়া থেকে সকাল ৬:২০ এ ছাড়ে, সকাল ৮:৫০ এ ঝাড়গ্রাম পৌঁছায়।

    • স্টিলার এক্সপ্রেস / মেদিনীপুর লোকাল সংযোগকারী ট্রেন।

  • ভাড়া: ২য় সিটিং (2S) ₹৯০ - ₹১২০, চেয়ার কার (CC) ₹৩১৫ - ₹৩৫০।

(খ) সড়কপথে / নিজস্ব গাড়িতে (By Road):

  • রুট: কলকাতা ➔ ধুলিয়াগড় ➔ কোলাঘাট ➔ খড়গপুর ➔ লোধাশুলি ➔ ঝাড়গ্রাম শহর।

  • দূরত্ব ও সময়: প্রায় ১৭৫ - ১৮০ কিমি (সময় লাগে ৩.৫ থেকে ৪ ঘণ্টা)।


কোথায় থাকবেন ও ফোন নম্বর সংক্রান্ত টিপস (Accommodation Options)

অফবিট স্পটগুলো ঘোরার জন্য আপনি ঝাড়গ্রাম শহরে অথবা সরাসরি বেলপাহাড়িতে থাকতে পারেন।ঝাড়গ্রাম বা বেলপাহাড়ির বিভিন্ন হোটেল, রিসোর্ট ও হোমস্টের ফোন নম্বর, ভাড়া এবং availability সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হতে পারে। আমরা যে নম্বর ও তথ্য দিচ্ছি, সেগুলো আমাদের তথ্য সংগ্রহের সময়ের ভিত্তিতে দেওয়া হয়েছে। তাই বুকিং করার আগে অবশ্যই ফোন করে নম্বরটি সক্রিয় আছে কি না, বর্তমান ভাড়া, রুম availability এবং অন্যান্য সুবিধা একবার নিশ্চিত করে নেবেন।

১. রাজবাড়ি ও রাজকীয় কটেজ (Royal Heritage Stay)

  • ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি ট্যুরিজম প্রজেক্ট (WBTDCL)

    • কেন থাকবেন: ঐতিহ্যবাহী ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ির প্রাঙ্গণে রাজকীয় আমেজ ও সুশৃঙ্খল আতিথেয়তা উপভোগ করতে।

    • ফোন / হেল্পলাইন: +91-9147065770 / ১৮০০ ২১২ ১৬৫৫ (টোল ফ্রি)

    • ওয়েবসাইট: wbtourism.gov.in

  • ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ি প্যালেস হেরিটেজ (প্রাইভেট কটেজ)

    • ফোন: +91-6294024319 / +91-7811859101

২. সরকারি ইকো-ট্যুরিজম কটেজ (Government Eco-Resorts)

  • ঝাড়গ্রাম প্রকৃতি পর্যটন কেন্দ্র (WBFDCL - বন বিভাগ)

    • কেন থাকবেন: শাল ও পিয়াল বনের মাঝে প্রকৃতি সংলগ্ন পরিবেশে থাকার জন্য অন্যতম সেরা জায়গা।

    • ফোন: +91-7604044479 (WBFDCL বুকিং অফিস)

    • ওয়েবসাইট: wbfdc.net

  • হাতিবাড়ি ইকো ট্যুরিজম সেন্টার (Hatibari Eco Tourism)

    • অবস্থান: সুবর্ণরেখা নদীর তীরে হাতিবাড়ি জঙ্গল সেকশন।

    • ফোন: +91-7604044479

৩. সেরা প্রাইভেট হোটেল ও রিসোর্ট (Private Hotels & Resorts)

  • গ্রিন ভিউ হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট (Green View Hotel & Resort)

    • কেন থাকবেন: আধুনিক সুযোগ-সুবিধা, সুইমিং পুল এবং চমৎকার পরিবেশ।

    • ফোন: +91-9709702222 / +91-7602828870

  • গ্রামের বাড়ি রিসোর্ট (Gramer Bari Resort)

    • কেন থাকবেন: ট্র্যাডিশনাল কটেজ ও মাড হাউস অভিজ্ঞতা পাওয়ার জন্য পরিচিত।

    • ফোন: +91-8100344105

  • সোমানি ইন (Somani Inn)

    • অবস্থান: ঝাড়গ্রাম রেলওয়ে স্টেশনের খুব কাছে (বাজেট ও ফ্যামিলি ফ্রেন্ডলি)।

    • ফোন / বুকিং: ডাইরেক্ট বুকিং অথবা মেকমাইট্রিপ/গোআইবিবো অ্যাপের মাধ্যমে বুক করা যায়।

৪. নামকরা ও নিবন্ধিত হোমস্টে (Registered Homestays)

  • লালমাটি হোমস্টে (Lalmati Homestay)

    • ফোন: +91-8436622443

  • বেলপাহাড়ি বাগান বাড়ি হোমস্টে (Belpahari Bagan Bari Homestay)

    • অবস্থান: বেলপাহাড়ি অফবিট সেকশন ঘুরতে যাওয়ার জন্য আদর্শ।

    • ফোন: +91-7547928202

  • ওম বিন্দু হোমস্টে (Om Bindu Homestay)

    • ফোন: +91-9932977753

বিশেষ দ্রষ্টব্য: ছুটির মরসুমে বা শীতকালে ঝাড়গ্রাম ঘুরতে যাওয়ার আগে অন্তত ১৫-২০ দিন আগে থেকে রুম বুক করে রাখা ভালো। সরকারি কটেজগুলোর জন্য পশ্চিমবঙ্গ পর্যটন উন্নয়ন নিগম (WBTDCL) বা বন বিভাগের (WBFDCL) অফিসিয়াল ওয়েবসাইট থেকে অনলাইন বুকিং করা সুবিধাজনক।


২ দিন ৩ রাতের আনুমানিক খরচের তালিকা (Budget & Cost Breakdown)

এখানে দেওয়া খরচের তালিকাটি আমাদের ভ্রমণের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একটি আনুমানিক হিসাব মাত্র। আপনার যাতায়াতের মাধ্যম, থাকার ধরন, খাবার, কতজন একসঙ্গে যাচ্ছেন এবং কোথায় কতক্ষণ থাকছেন—এসবের উপর মোট খরচ কম-বেশি হতে পারে। তাই এই হিসাবকে চূড়ান্ত খরচ হিসেবে না ধরে, আপনার নিজের ভ্রমণ পরিকল্পনা অনুযায়ী বাজেট তৈরি করুন।

খরচের বিবরণ

প্রতি জন খরচ (Approx.)

ট্রেন টিকিট (আসা-যাওয়া)

₹২০০ – ₹৪০০

হোটেল/হোমস্টে (২ রাত - শেয়ারিংয়ে)

₹১,২০০ – ₹২,০০০

লোকাল সাইটসিয়িং গাড়ি (Bolero/Sumo/Auto - ৪-৬ জন শেয়ারিং)

₹১,৫০০ – ₹২,০০০

খাবার দাবার (২ দিন)

₹১,০০০ – ₹১,৫০০

মোট আনুমানিক বাজেট:

₹৩,৯০০ – ₹৫,৯০০ (জনপ্রতি)


তবে ঝাড়গ্রামের সৌন্দর্য এই কয়েকটি জায়গাতেই শেষ নয়—এখানে এখনও অনেক অচেনা, নিরিবিলি ও সুন্দর জায়গা রয়েছে, যেগুলো হয়তো আমাদেরও এখনও ঘুরে দেখা হয়ে ওঠেনি। আপনি যদি ঝাড়গ্রামে এমন কোনো সুন্দর বা অফবিট জায়গা ঘুরে থাকেন, তাহলে অবশ্যই আমাদের কমেন্ট বক্সে সেই জায়গার কথা জানান। আপনার অভিজ্ঞতা, যাওয়ার পথ কিংবা জায়গাটির বিশেষত্ব আমাদের সঙ্গে শেয়ার করুন। আপনাদের জানানো সেই অজানা জায়গাগুলোর গল্পই হয়তো আগামী দিনে Offbeat Yatra-র মাধ্যমে আরও অনেক ভ্রমণপ্রেমীর কাছে পৌঁছে যাবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন (0)
নবীনতর পূর্বতন